সন্তানের ভালো অভ্যাস তৈরির কৌশল কথা

প্রফেসর ইসমাত রুমিনা

শরীর ও মন ১৫ জুন ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:১৭

প্রতিটি পরিবারই শিশুদের ভালোবাসে। শিশুদের মধ্যে ভালো অভ্যাস গড়ে উঠুক সেটা কে না চায়? কিন্তু কোন বয়সে কীভাবে শিশুকে লালন পালন করলে ভালো অভ্যাসগুলো তৈরি করা যায়, সেটা আমাদের অনেকেরই সঠিকভাবে জানা থাকে না। কিছু নির্দেশনা অনুসরণ করে খুব সহজেই শিশুর মধ্যে আদব-কায়দা, নিয়ম-শৃঙ্খলা ও ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। করোনাকালের ঘরে থাকার বাধ্যবাধ্যকতার বা লকডাউনের এই সময়ে শিশুর অভিভাবক হিসেবে আপনিও এই কৌশলগুলো চর্চা করতে পারেন। আপনার সক্রিয়তায় অসহায়ের সহায় হয়ে ওঠার গুণাবলীর গুরুত্ব বোঝাতে এ সময়ের শিক্ষা প্রিয় শিশুদের সারাটি জীবন করে তুলতে পারে আরো বেশি মানবিক, উদার ও দক্ষ মানুষ। বাসার ছোট্ট শিশুকে ভালো কাজের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাতে অভ্যস্ত করার জন্য তাই এই সময়টিই হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত। আমরা যদি কিছু নিয়ম মেনে চলি, স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো রপ্ত করাতে পারি তাহলে সুন্দর হতে পারে জীবনযাপন, পাশাপাশি স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে শিশু।

একটি চারাগাছের কথা ধরা যাক। চারাগাছকে মাটির সঙ্গে রোপিত হতে চাই বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যা।
একবার চারাগাছটি মাটির সঙ্গে শক্তভাবে গেঁথে গেলে পরবর্তী সময়ে গাছটির জন্য বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয় না। অপরদিকে বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যার অভাবে গাছটি দুর্বলভাবে বেড়ে ওঠে। মানবশিশুর ক্ষেত্রেও কথাটি একইভাবে প্রযোজ্য। জন্মের প্রথম বছরগুলোতে শিশুর প্রতি মনোযোগ, শিশুকে সময় দেয়া, ভালো অভ্যাস শিশুর সারা জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। কারণ শিশুরা তাদের বাবা-মাকে দেখেই তাদের অভ্যাসগুলো রপ্ত করতে শেখে, জীবনে উন্নতি লাভ করে। বাবা-মায়েরাই সব সময় তাদের শিশুদের জন্য প্রথম উদাহরণ হন। তারা এমন একজন- শিশুরা কোনো সমস্যায় পড়লে যাদের কাছে যায়, তাদের স্বভাব ও অভ্যাসগুলোই শিশুরা তাদের জীবনে প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে। বড় হয়ে শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের আচরণ এবং কাজকর্মকে অনুকরণ করে এবং বাবা-মায়েরাই তাদের সন্তানদের জন্য রোল মডেল হন। তাদের জ্ঞান ও অভ্যাসগুলো বাচ্চাদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। সুতরাং, ভালো এবং খারাপ অভ্যাসগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে এবং সেগুলোর মধ্যে থেকে ভালোটিকে বেছে নিতে শিশুকে শিক্ষা দেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

১. পরিবারের সদস্যরা শিশুর জন্য অনুকরণীয় মডেল:
দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশু অনুকরণ করতে ভালোবাসে। এ বয়সের শিশু বিভিন্ন ধরনের কাল্পনিক বা নাটকীয় খেলা খেলে। যেমন- মায়ের মতো রান্না করে, বাবার মতো পেপার পড়ে আবার ড্রাইভার হয়, ভাবী সেজে মেহমানদারী করে কিংবা প্লেন চালায়। এ থেকে প্রমাণ মেলে যে, শিশু তার আশেপাশে যা দেখে বা তার সামনে যা করা হয় তা পর্যবেক্ষণ করে এবং তা হুবহু অনুকরণ করতে পারে। সুতরাং যে আচরণগুলো আমরা শিশুর মধ্যে দেখতে চাই বা শিশুর মধ্যে যেসব অভ্যাসগুলো তৈরি করতে চাই পরিবারের সদস্যরা সেগুলো চর্চা করলে এ বয়সে শিশু আপনা আপনি তা অনুকরণ করবে এবং সে অভ্যাস ও আচরণগুলো শিশুর মধ্যে গড়ে উঠবে। যেমন- বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, বিনয়, সম্ভাষণ, ধন্যবাদ জ্ঞাপন, সহযোগিতা, ভাগাভাগি করা, সত্য কথা বলা, ঝগড়াঝাটি না করা ইত্যাদি। এটিকে বলা হয় পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষণ, যা কথায় নির্দেশনা দিয়ে শেখানোর চেয়ে অনেক বেশি ফলপ্রসূ হয়। পরিবারের সদস্যদের অনুকরণের মাধ্যমে শিশুরা ভালো বা খারাপ অভ্যাস রপ্ত করে। শিশুকে ভালো অভ্যাস শেখানোর জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। তাহলে শিশুকে আদেশ দিয়ে বা নিষেধ করে কোনো কিছু শেখানোর দরকার হয় না।

২.শিশুর মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়া:
যখন শিশু এমন কিছু করে যা আমাদের বড়দের পছন্দ হচ্ছে না, তখন আমরা সাধারণত সেই কাজটি নিয়েই বলতে থাকি। যেমন- ‘মেঝেতে খাবার ফেলো না এটা নোংরা হবে, বারবার বলছি তুমি তাও শুনছো না।’ এভাবে বলতে বলতে যখন ক্লান্ত হয়ে যাই তখন সারাংশ দাঁড় করাই, ‘ছেলেটা/মেয়েটা আমার কথা মোটেও শোনে না। যেটা মানা করা হয় সেটাই করে। ভীষণ দুষ্টু হয়েছে।’

এরকম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সুন্দর সমাধান হলো শিশুর মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়া। যেমন- নিজের প্লেট থেকে খাবার ফেলে দেয়ার সময় বলতে পারি- দেখো তোমার প্লেটে কত ধরনের সবজি- এটার নাম গাজর, এটা টমেটো ইত্যাদি। কিংবা বলা যায় যে, এতো মজার খাবার আমরা তাড়াতাড়ি শেষ করবো, তারপর তোমাকে একটি মজার গল্প শোনাবো। তার মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে পারলেই সে মেঝেতে খাবার ফেলা বন্ধ করে মায়ের দিকে মনোযোগী হবে। এভাবে তাকে কৌশলে সুন্দর কথা শোনাতে হবে। মা-বাবা বুদ্ধি করে সন্তানের পছন্দের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসবেন। কোন্‌ শিশু কীভাবে মনোযোগী হবে সেটা মা-বাবাই ভালো বুঝবেন। কোনো খারাপ অভ্যাস দূর করতে এ পদ্ধতিটি ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

৩. শিশুর ভালো কাজের প্রশংসা করা:
ভালো অভ্যাস তৈরির জন্য শিশুকে ছোট ছোট ভালো কাজে প্রশংসা করতে হবে। কোনো ভালো কাজের পর বুকে জড়িয়ে ধরা, চোখের দিকে তাকিয়ে হাসি, সে যা করছে তা আগ্রহ নিয়ে দেখা, বারবার ‘সাব্বাশ!’, ‘চমৎকার!’, ‘লক্ষ্মী’ বা এ ধরনের উক্তি করা, হাতে তালি দেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে স্বীকৃতি দিলে শিশু ভালো কাজে উৎসাহিত হয় ও তাড়াতাড়ি শেখে। তিন থেকে চার বছর বয়স থেকেই শিশুরা যেকোনো কিছু ধরতে, ছুঁতে, গন্ধ নিতে, শুনতে ও স্বাদ নিতে চায়। ওরা সব সময় নতুন কিছু শিখতে চায়। এই বয়সেই আমরা শিশুদের আগ্রাসী আচরণ করতে দেখি। শিশুদের এই আগ্রাসী আচরণ মানসিক এবং আচরণগত বিকাশের একটি সাধারণ অংশ। প্রায় সব শিশু ভীষণভাবে আবেগতাড়িত হয়ে চিৎকার করে, লাথি মারে বা আঘাত করে। তবে সাধারণত শিশুরা তাদের চারপাশের পরিবেশে আগ্রাসী আচরণ করতে দেখলে নিজেরাও আগ্রাসী আচরণ করতে শেখে। শিশুরা এগুলো কেন করে? কারণ, তাদের উদ্বেগ বা হতাশাগুলো মোকাবিলা করতে অসুবিধা হয়। অনেক সময় বড়দের মতো করে নিজেদের অনুভূতির কথাগুলো বলতে না পারলেও শিশুরা আগ্রাসী আচরণ করে। আরো কিছু কারণ আছে, তবে শিশুর আচরণের যেকোনো অস্বাভাবিকতায় একজন মনোচিকিৎসাবিদের কাছে গেলে আচরণ সম্পর্কে আরো চমৎকার বিশ্লেষণ জানতে পারা যায়। আর তাই এ সময় শিশুর ভালো কাজের প্রশংসা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে পরিবারের সদস্যদের ইতিবাচক সক্রিয় ভূমিকা ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।

৪. কোনো কিছু শেখানোর জন্য প্রয়োজন ধৈর্যের, শাস্তি নয়:
শিশুর শেখার জন্য সময়ের দরকার হয়। তাদের কোনো কিছু শেখাতে মা-বাবার তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। সময় নিলে ফলাফল ভালো পাওয়া যায়। তাড়াহুড়া করলে শিশুর মধ্যে হতাশা চলে আসতে পারে। সে মনে করে যে সে শিখতে পারছে না, এতে তার মন খারাপ হয়। শিশুকে খাওয়া, ঘুমানো, টয়লেটের জন্য জোরাজোরি বা চাপাচাপি করা যাবে না। আমরা বেশিরভাগ মা-বাবাই সন্তানদের শেখানোর ক্ষেত্রে খুব ধৈর্যের পরিচয় দিই না। অল্পতেই আমরা রেগে যাই, চিৎকার করি, ভয় দেখাই, চড়-থাপ্পড় মারি। এতে শিশুর শেখাটা আরো পিছিয়ে যায়।

৫. শিশুকে যা শেখানো হবে সেটায় অবিচল থাকা:
শিশুকে যখন কোনো নিয়মশৃঙ্খলা শেখানোর চেষ্টা করা হয় তখন সেই নিয়ম যেনো ভঙ্গ না হয়, সেজন্য সচেতন থাকতে হবে। কোনটা ঠিক কোনটা ভুল- এটা যেন শিশুর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই কাজকে কোনো সময় ভালো, কোনো সময় খারাপ বলা যাবে না। যেমন মিথ্যা বলা ঠিক না। ছোট বা বড় যেকোনো কাজ বা যেকোনো সময়েই করা অনুচিত বা খারাপ- সেটা যেন শিশু বুঝতে পারে। তাহলে তার মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয় না। শিশুকে যা শেখানো হবে, তা যেন কথার কথা না হয়। শিশুদের জন্য সঠিক আচরণ এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা যেন যুদ্ধের মতো মনে হয়। কিন্তু পরিবারের অভিভাবক হিসেবে আপনাকে ধৈর্যশীল হতে হবে এবং সঠিকভাবে তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে। অস্বীকার করার কোনো কারণই নেই যে, আদর্শ মা-বাবা আদর্শ সন্তান তৈরির মূল কারিগর। বাবা-মায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সন্তান গড়ে উঠে একজন আদর্শবান মানুষ হিসেবে। তাদের সম্পর্ক নিঃশর্ত ভালোবাসার। কিন্তু সেই ভালোবাসায় রয়েছে স্নেহ আর শাসনের যথাযথ সমন্বয়। আদর্শ মাতা-পিতা হতে গেলে এই সমন্বয়টা বজায় রাখা খুব জরুরি। কীভাবে তা বজায় রাখবেন, এর জন্য আপনার শুভবোধ এবং ইচ্ছাশক্তিই হতে পারে সবচেয়ে বেশি সহায়ক শক্তি।

শিশুকে পরিবারের সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার, আগত অতিথি আপ্যায়নে সাহায্য করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দরজা খুলে দেয়া, খাবার এগিয়ে দেয়া থেকে হতে পারে সূচনা। বয়স্কদের সাহায্য করার শিক্ষা দিতে হবে। কারও হাত থেকে অসাবধানে কোনো কিছু পড়ে গেলে তাকে বস্তুটি তুলে দিয়ে সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তা শিশুদেরকে বোঝাতে হবে। শিশু কোনো ভালো কাজ করলে আমরা প্রশংসা করে থাকি। তাকেও প্রশংসা করা শেখাতে হবে। কারও ভালো কাজ দেখলে সে যেন প্রশংসা করে, তেমন অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বয়সে ছোটদের আদর করার মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি শেখাতে হবে শিশুকে। রাগ করার খারাপ দিকের শিক্ষা দিয়ে রাগ করা থেকে বিরত রাখতে হবে। শিশুদের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আবশ্যক। তাদের শেখাতে হবে পরিবেশ রক্ষা করতে। ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলা থেকে বিরত রাখতে হবে। নির্দিষ্ট জায়গাতে ময়লা ফেলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। বাড়িতে গাছ লাগানোর আবশ্যকতা বোঝাতে হবে। গাছে নিয়মিত পানি দেয়ার বিষয়টি শিশুকে বুঝিয়ে দিতে হবে। শিশুর বৃক্ষপ্রেম তৈরি হলে আমাদের পৃথিবী সুন্দর থাকবে। শিশুকে অপচয় করা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিতে হবে। কাজের শেষে ফ্যান-লাইট বন্ধ করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। পানি অপচয়ের কুফল বোঝাতে হবে। শিশুকে তৈরি করে তুলতে হবে আদর্শ নাগরিক হিসেবে।

এভাবেই আপনি আপনার সন্তানদের মানবিকতার, সুশৃঙ্খলার শিক্ষা দিতে পারেন, তবে আপনার বাচ্চা এটি প্রয়োগ করে কিনা, তা দৈনন্দিন জীবনে বাবা-মা হিসাবে আপনি কতটা ভালো তার ওপরই নির্ভর করবে। তাদের সঠিক পথ দেখান এবং ইতিবাচক শক্তিবৃদ্ধি ও প্রশংসা সহকারে এটি বজায় রাখার জন্য উৎসাহিত করুন। পরিশেষে বলতে পারি, প্রত্যেক শিশুর জন্য ভালোবাসা হচ্ছে একটি বিরাট শক্তি, যা তাকে নিরাপত্তা দেয়। ভালোবাসা হলো প্রত্যেক শিশুর মানসিক চাহিদা, যাকে মস্তিষ্কের খাদ্য বলা হয়। শিশুর সার্বিক বিকাশে প্রয়োজন আদর-ভালোবাসা মেশানো যত্ন ও তার সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান। তাই আপনার সন্তানকে কথায় ও কাজের মধ্য দিয়ে বারবার বুঝিয়ে দিন, আপনার কাছে এই পৃথিবীতে তার মতো মূল্যবান আর কেউ নেই।

 [লেখক: অধ্যক্ষ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, আজিমপুর, ঢাকা]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md.Shafiullah(Rubel)

২০২০-০৭-০৯ ১৭:৪৬:২৭

অভিভাবকদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য.

Hanif

২০২০-০৬-১৬ ২২:৩০:০৯

একটি অতি সুন্দর ও প্রয়োজনীয় লেখা। লেখিকাকে অনেক ধন্যবাদ।

Hanif

২০২০-০৬-১৬ ২২:১২:৫৯

একটি অতি সুন্দর ও প্রয়োজনীয় লেখা। লেখিকাকে অনেক ধন্যবাদ।

আপনার মতামত দিন

শরীর ও মন অন্যান্য খবর



শরীর ও মন সর্বাধিক পঠিত